ডেঙ্গুর কবলে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal under the grip of dengue)
নবম, দশম একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বাংলা প্রবন্ধ রচনা “ডেঙ্গুর কবলে পশ্চিমবঙ্গ (grip of dengue)” দেওয়া হলো। এই প্রবন্ধ রচনাটি সাঁতরা পাবলিকেশনের বই থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। অনুসরণে লেখা যায়ঃ (১) ডেঙ্গু সমস্যা মোকাবিলায় পশ্চিমবঙ্গ, (২) মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু।
প্রবন্ধ সূত্রঃ ভূমিকা- ডেঙ্গু ও তার নামকরণ-ডেঙ্গু জ্বর ও তার সংক্রমণের ইতিহাস-ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল, সংক্রমণ এবং উপসর্গ-পশ্চিমবঙ্গ ও ডেঙ্গু-ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায়-উপসংহার।
এক নজরে

ভূমিকা
অতীতে মশাবাহিত যে সমস্ত রোগ পৃথিবীময় মহামারির আকার নিয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে ভীতিপ্রদ ছিল ম্যালেরিয়া। কুইনাইন আবিষ্কারের হাত ধরে ম্যালেরিয়ার সেই মৃত্যুভয় থেকে পৃথিবীবাসী আজ মুক্ত। কিন্তু বিগত প্রায় দুই শতক ধরে পৃথিবী জুড়ে কামড় বসিয়েছে আর এক নতুন উপদ্রপ-ডেঙ্গু। বলা বাহুল্য, মশাবাহিত এই রোগের প্রকোপ থেকে রেহাই পায়নি আমাদের পশ্চিমবঙ্গও।
ডেঙ্গু ও তার নামকরণ
প্রধানত এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এডিস নামক একপ্রকার মশাবাহিত ভাইরাসঘটিত ব্যাধি হল ডেঙ্গু (Dengue)। ডেঙ্গু Flaviviridae গোত্রভুক্ত ভাইরাস। ‘ডেঙ্গু’ শব্দটির উদ্ভবের সময়কাল সঠিকভাবে চিহ্নিত করা শক্ত। তবে মনে করা হয়, শব্দটি এসেছে ‘সোয়াহিলি’ শব্দবন্ধ ‘কা-ডিঙ্গা পেপো’ থেকে, যার অর্থ হল দুষ্ট আত্মার কারণ ঘটিত রোগ। সোয়াহিলি শব্দ ডিঙ্গা সম্ভবত স্পেনীয় শব্দ ‘ডেঙ্গু’-র মূলে রয়েছে, যার অর্থ খুঁতখুঁতে বা সাবধানি, যা ডেঙ্গু জ্বরের হাড়ের ব্যথায় আক্রান্ত চলনকে বর্ণনা করে।
ডেঙ্গু জ্বর ও তার সংক্রমণের ইতিহাস
ডেঙ্গু জ্বরের প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় জিন বংশের (২৬৫-৪২০ খ্রিস্টাব্দে) এক চিন চিকিৎসা বিজ্ঞানের এনসাইক্লোপিডিয়ায়, যেখানে উড়ন্ত পতঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ‘জলীয় বিষে’-র কথা বলা হয়েছে। তবে ডেঙ্গু মহামারি সম্পর্কিত সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় ১৭৭৯-১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে। এই সময়েই এশিয়ার বহু দেশ, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকায় কামড় বসিয়েছিল এই মারণ রোগ। আঠারো শতকের শেষ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব অনিয়মিত হলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালপর্বে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রোগটি মহামারির আকার ধারণ করে। এরপর ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ফিলিপাইনে রোগটি চরম আকার ধারণ করে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে রোগটি শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় Dengue Hemorrhagic fever & Dengue Shock Syndrome পরিলক্ষিত হয়। ১৯৮০ ও ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে মহামারীর আকারে ডেঙ্গু ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল, সংক্রমণ এবং উপসর্গ
মশা সাধারণত ময়লা জলেই বসবাস করে, ব্যতিক্রম এডিস মশা। কারণ এডিস মশা স্বচ্ছ জলে এবং লোকালয়ের নিকটবর্তী গাছপালায় বসবাস করে। আর এই এডিস মশাই বহন করে ডেঙ্গু ভাইরাস। অতএব ভাইরাসটির উৎপত্তিস্থল ও মশার আবাসক্ষেত্রের কাছাকাছি হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে বলতে হল ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল হল বাড়ির কাছাকাছি পচনশীল লতাপাতা, জমা জল, খাবার, নর্দমা, ডোবা ইত্যাদি। গ্রীষ্ম-বর্ষা অর্থাৎ, মে থেকে সেপ্টেম্বর এই পাঁচ মাস সময়কালকেই ডেঙ্গুর মৌসুম বলা চলে। গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলেই এই রোগ প্রকোপ বেশি দেখা যায়। ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই উপসর্গবিহীন থাকে, লক্ষ্মণ হিসেবে যেটুকু থাকে তা হল জ্বর। ডেঙ্গু- জ্বরে আক্রান্ত রোগীর উপসর্গগুলি হল-(ক) ১০৫° ফারেনহাইটের কাছাকাছি জ্বর, – (খ) খাদ্যে অরুচি, বমি (গ) সারা শরীরে, হাড়ে, মাথায় অসহ্য – ব্যথা, (ঘ) রক্তচাপ কমে যাওয়া, (ঙ) দেহে ফ্লুইডের অভাব অনুভূত হওয়া ইত্যাদি।
আরও দেখুনঃ রাজা রামমোহন রায়ঃ বাংলা প্রবন্ধ রচনা | Raja Ram Mohan Roy Bangla Probondho Rochona
পশ্চিমবঙ্গ ও ডেঙ্গু (grip of dengue)
সারা পৃথিবীর মতো পশ্চিমবঙ্গও ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে মুক্ত নয়। ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম কলকাতায় ডেঙ্গু আক্রান্তের কথা নথিভুক্ত হয়। তারপর ১৮৩৬, ১৯০৬, ১৯১১ এবং ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের কলকাতায় প্রায় ৪০% মানুষ এই অসুখে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ১৯৬৩-‘৬৪ নাগাদ ভারতে প্রথম Dengue hemorrhagic fever-এ আক্রান্ত হয় কলকাতা। ২০০৫ ও ২০১২-তেও বিপুল সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আক্রান্ত হন ডেঙ্গুতে। বর্তমানে এই করোনার যুগেও ডেঙ্গু আমাদের পিছু ছাড়েনি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের উপায়
ডেঙ্গু প্রতিরোধী টিকা কিছু দেশে অনুমোদিত হয়েছে, তবে এই টিকা শুধু একবার সংক্রমিত হয়েছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেই কার্যকর। তাই এডিস মশার মরণ কামড় এড়িয়ে চলাই হল ডেঙ্গু ঠেকানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। অতএব প্রথমেই দরকার এডিস মশার বংশ বিস্তার রোধ করা। আর এর জন্য প্রয়োজন বাড়ি ও বাড়ির চারপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, বাড়ির কাছাকাছি জল জমতে না দেওয়া ইত্যাদি। এডিস মশা সাধারণত সকালে ও বিকেলের শেষ দিকে বেশি সক্রিয় থাকে। তাই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দিনের বেলাতেও মশারির ব্যবহার করতে হবে।
উপসংহার:
ডেঙ্গুর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার একটাই রাস্তা, আর সেটা হল সচেতনতা। পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ভারত সরকার; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সকলেই ডেঙ্গু সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্পেন চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়, তাই সরকারি উদ্যোগের, পাশাপাশি ডেঙ্গু মুক্ত বাংলা গড়ার জন্য আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগও একান্ত আবশ্যক। করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গুও আমাদের জীবনের একটি বাস্তব সত্য, কাজেই তাকে সচেতনভাবে প্রতিরোধ করেই আমাদের মানব সভ্যতার অগ্রগতিকে অব্যাহত রাখতে হবে-বলাই বাহুল্য।
আমাদের পোষ্টের লেটেস্ট আপডেট পেতে আমাদের Whatsapp Channel জয়েন করুন এবং Telegram Channel জয়েন করুন।
Latest Posts:
- রসায়ন প্রশ্নপত্র- উচ্চমাধ্যমিক ২০২৭ তৃতীয় সেমিস্টার | HS 2027 Chemistry Question Paper Semester 3 PDF
- উচ্চমাধ্যমিক ২০২৭ সেমিস্টার ৩ ভূগোল প্রশ্নপত্র PDF | WBCHSE Class 12 Geography Sem-3 Question Paper Download
- উচ্চমাধ্যমিক ২০২৭ ইতিহাস প্রশ্নপত্র তৃতীয় সেমিস্টার | WBHS 2027 Sem-3 History Question Paper PDF Download
- বাংলা প্রশ্নপত্র-উচ্চমাধ্যমিক ২০২৭ সেমিস্টার ৩ পরীক্ষা | 2027 HS Sem-3 Bengali Question Paper PDF
- ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি (dr shyama prasad mukherjee) প্রবন্ধ রচনা | মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য




