বনসৃজনের প্রয়োজনীয়তা অথবা, বৃক্ষই আমাদের পরম বন্ধু (Bangla Probondho Rochona)
ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বাংলা প্রবন্ধ রচনা দেওয়া হলো। “বনসৃজনের প্রয়োজনীয়তা অথবা, বৃক্ষই আমাদের পরম বন্ধু (Bangla Probondho Rochona)” । রচনা সূত্র নিচে দেওয়া আছে এবং প্রতিটি পয়েন্ট ব্যাখ্যা করা আছে।
রচনা সূত্র: ভূমিকা-প্রাচীন ভারতবর্ষে বৃক্ষ পুজা- ব্যক্তিজীবনে বৃক্ষের অবদান-নগরজীবনের প্রসার ও বৃক্ষচ্ছেদন-বনভূমি সংরক্ষণ ব্যবস্থা-সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ-উপসংহার।
“বনের মন্দির মাঝে তরুর তম্বুরা বাজে অনন্তের উঠে স্তবগান।”
-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- একটি গাছ একটি প্রাণ – প্রবন্ধ রচনা | Ekti Gach Ekti Pran
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-বাংলা প্রবন্ধ রচনা | Science and Technology
- বিজ্ঞানের ভালো ও মন্দ- বাংলা প্রবন্ধ রচনা | The good and bad of science- Bangla Probondho Rochona
- শিক্ষা বিস্তারে গণমাধ্যমের ভূমিকা | The Role of Mass Media in the Expansion of Education
- প্রাকৃতিক বিপর্যয়—সমস্যা ও প্রতিকার | Prakritik Biporjoy
- একটি গাছের আত্মকথা- প্রবন্ধ রচনা | Autobiography of a Tree
⬕ ভূমিকা:
বিশ্বপ্রাণের মূক ধাত্রী বৃক্ষরাজি আদি অনন্তকাল ধরে সমগ্র ভূলোকের মাঝে অমৃতধারা প্রবাহিত করে প্রাণের তেজ, রস ও লাবণ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। তাই ঋগ্বেদিক যুগ থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতি করুণারূপী তরুদলকে কখনও বিনম্র কৃতজ্ঞতায়, ভক্তিনম্র চিত্তে বন্দনা করে গেছে আবার কখনো-বা তাকে গ্রহণ করেছে পরম বন্ধুজ্ঞানে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাকারী উদ্ভিদসমূহের সঙ্গে মানবসভ্যতার নিবিড় বন্ধন তাই দ্যুলোক সৃষ্টির সমকালীন। তাই বৃক্ষবন্দনা ভারতীয় সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
⬕ প্রাচীন ভারতবর্ষে বৃক্ষ পূজা:
প্রাচীন ভারতবর্ষে বৃক্ষ পূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। ফুল-ফল-ছায়া প্রদানকারী রূপে, আদিম মানুষের প্রধান আশ্রয়স্থল রূপে, প্রাণীজগতের প্রাণদায়ী বায়ুর শোধক রূপে বৃক্ষের সঙ্গে মানবজীবনের নিবিড় যোগসূত্রকে প্রাচীন ভারতবাসীরা পরমজ্ঞানে স্বীকার করতেন। তাই তৎকালীন সময়ে বনস্পতির সুরক্ষিতকরণের উদ্দেশ্যেই জারি করা হত বিধিনিষেধের বিজ্ঞপ্তি, বট-অশ্বত্থাদি বৃক্ষের পূজার নির্দেশাবলি।
⬕ ব্যক্তিজীবনে বৃক্ষের অবদান :
প্রাচীনকাল থেকেই মানবজীবনে বৃক্ষের প্রয়োজন প্রশ্নাতীত। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অবশ্য প্রয়োজনীয়তাকে পূরণ করে প্রকৃতির সবুজের দল। কাগজ, বস্ত্র প্রভৃতি শিল্পের কাঁচামাল সংগৃহীত হয় অরণ্যাঞ্চল থেকে; আবার গৃহনির্মাণ, গৃহস্থের আসবাবপত্র তৈরি, বিবিধ যানবাহন নির্মাণ শিল্পের কাঁচামালের জোগান মেলে শাল, সেগুন, আবলুস, মেহগনি প্রভৃতি গাছের কাঠ থেকে। তা ছাড়া বৃক্ষজাত নানাপ্রকার পদার্থ একদিকে যেমন বহু দরিদ্র মানুষের জীবিকা সংগ্রহের পথ প্রশস্ত করে তেমনি অন্যদিকে উদ্ভিদলব্ধ ফল প্রাণীকুলের ক্ষুধানিবৃত্তি ঘটায়।। একইভাবে বৃক্ষতল থেকে প্রাপ্ত শুষ্ক পত্রসমূহ জ্বালানিরূপে কিংবা উত্তাপ প্রদানের কাজে ব্যবহৃত হয়; হোগলা, গোলপাতা গৃহস্থের ছাউনিকে পূর্ণতা দান করে শুধু তাই নয়, বনজসম্পদ-ধন্য ভারতবর্ষের কাষ্ঠসম্পদ বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে এই দেশের অর্থভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়। বায়ুতে অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইডের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রেখে একদিকে যেমন সালোকসংশ্লেষকারী বৃক্ষরা জীবকুলকে শ্বাসবায়ু প্রদান করে, তেমনি অন্যদিকে ধরিত্রী-বক্ষে মৃত্তিকাক্ষয় নিবারণ, মৃত্তিকার রসপুষ্টি সাধন, ধরণিগর্ভে জলসম্পদের সঞ্চয় ঘটানো ও আবহাওয়া প্রশান্তি বিধানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে। তার পুষ্পশোভা আমাদের সৌন্দর্যলিঙ্গাকে তৃপ্ত করে।
⬕ নগরজীবনের প্রসার ও বৃক্ষচ্ছেদন:
প্রাচীন ভারতবর্ষের সৌন্দর্যের প্রধান অঙ্গ বন-তপোবনসমূহ বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভরতার যুগে-বিজ্ঞানের যুগে ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হয়ে গেছে। যন্ত্রদানবের ক্রুর প্রহারের ফলে স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষের প্রায় সাড়ে সাত কোটি হেক্টর বনভূমির প্রায় অর্ধেকাংশ স্বাধীনতা উত্তরকালে বহুকষ্টে নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় সমর্থ হয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বাসস্থান ও খাদ্যসংস্থান সমস্যাকে কেন্দ্র করে বহু অরণ্যাঞ্চল বর্তমানে গল্পকথায় রূপান্তরিত হয়েছে। অরণ্যের জায়গায় কোথাও গড়ে উঠেছে শহুরে সভ্যতা আবার কোথাও-বা কৃষিজমি নিজের আত্মবিস্তার ঘটিয়েছে। আন্তর্জাতিক হিসাবানুযায়ী যেখানে ৩৩.৩% বনভূমি থাকা প্রয়োজন সেখানে ভারতে তার পরিমাণ মাত্র ২৩%, যার অবশ্যস্বীকার্য ফলশ্রুতিতে প্রকোপ বেড়ে চলেছে অনাবৃষ্টির ও বেড়ে চলেছে মরুভূমির পরিমাণ। ফলত, বর্তমান যুগে মরু-রাক্ষসের করাল গ্রাস থেকে প্রকৃতিদেবীকে সুরক্ষিতকরণের জন্য, বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্যবিধানের জন্য চলছে নবনব অরণ্যানির বিকাশসাধন।
আরও দেখুনঃ বিজ্ঞান: আশীর্বাদ না অভিশাপঃ বাংলা প্রবন্ধ রচনা | Bigyan Ashirbad na Abhishap
⬕ বনভূমি সংরক্ষণ ব্যবস্থা:
বর্তমানের প্রযুক্তিবিদ্যার জয়গাথা রচনার যুগে একদিকে যেমন প্রয়োজনীয় বস্তু সামগ্রীর সঙ্গে সঙ্গে বিলাসদ্রব্যের উৎপাদনের প্রয়োজনে কর্তিত হচ্ছে উদ্ভিদসমাজ তখনই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানীরিক্ষায় এ সত্যও প্রমাণিত হচ্ছে যে পৃথিবীর বক্ষদেশের রুক্ষতা দূরীভূত। করে তাকে প্রাণরসে সিঞ্চিত করতে পারে অরণ্যদেবীই। তাই বর্তমানে ভারতীয় কেন্দ্রীয় তথা রাজ্যসরকার বনসংরক্ষণের অনুকূলে বহু আইন প্রণয়ন করেছেন। অবশ্য অরণ্যের স্নিগ্ধতা ও প্রাণপ্রাচুর্য সংরক্ষণের এই ব্যবস্থা শুধু আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষিত জগতেই নয় প্রাচীন ইতিহাসের ধারাতেও অব্যাহত ছিল। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে, অশোকের শিলালিপিতে পাওয়া যায় মৌর্যযুগের বৃক্ষরোপণ সংক্রান্ত তথ্যাবলি। হর্ষবর্ধনও পথের দু-ধারে অশোকের ন্যায় পথিকবর্গের জন্য ছায়াপ্রদায়ী বৃক্ষরোপণ করাতেন। বিশ্বসাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সর্বপ্রথম শান্তিনিকেতনে নৃত্য-গীত সহযোগে বৃক্ষরোপণোৎসব পালন করে বনমহোৎসবের পথপ্রদর্শন করান।
⬕ সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ:
১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় সরকার সর্বপ্রথম বনমহোৎসবের সূত্রপাত ঘটায় আনুষ্ঠানিকভাবে, যা প্রতি বছর নিয়মানুসারে পালিত হয়। দেশের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টিপাতের পরিমাণে ভারসাম্য আনয়ন, ভূমিক্ষয় রোধ প্রভৃতি উদ্দেশ্যকে পাথেয় করে শুধু জাতীয় সরকারই নয় গ্রাম-পঞ্চায়েত, ব্লক অফিস এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা ও সংঘগুলিও পথপ্রান্তে বৃক্ষরোপণ, চারা বিতরণ প্রভৃতি কর্মোদ্যোগে অংশগ্রহণ করছে। শুধু তাই নয়, সরকারের পক্ষ থেকে বৃক্ষনির্ভর শিল্পগুলিকে রক্ষিত করতে। ইউক্যালিপ্টাস, সুবাবুল, সুগি প্রভৃতি বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে।
⬕ উপসংহার :
প্রতি বছর ব্যাপক মাত্রায় বনমহোৎসব উপলক্ষ্যে চারা রোপণ সমাধা হলেও চারাগাছগুলির সংরক্ষণ ব্যবস্থায় শৈথিল্য, তদারকি ব্যবস্থার অভাব, জলসেচন ও পরিচর্যার অভাব ইত্যাদি কারণে ২৫% গাছ নষ্ট হয়ে যায়। তাই সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে বৃক্ষরোপণ ও রক্ষণ সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন, নতুবা বনমহোৎসব নামমাত্র উৎসবে পরিণত হবে। নগরজীবনের দুষিত পরিবেশকে শুদ্ধতার স্পর্শ দানের জন্য আমাদের স্মরণ করা প্রয়োজন প্রাচীনকালের আরণ্যক সভ্যতার উদার প্রশান্ত জীবনের কথা। কিন্তু বনভূমিতে প্রত্যাবর্তন সম্ভব নয় বলে আমাদের পার্শ্ববর্তী সমাজকে সবুজ বন্ধনে বেঁধে ফেললেই প্রকৃতিতে সমৃদ্ধি আসতে পারে।
Latest Posts:
- একটি গাছ একটি প্রাণ – প্রবন্ধ রচনা | Ekti Gach Ekti Pran
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-বাংলা প্রবন্ধ রচনা | Science and Technology
- HS Result 2026 Today: আজই প্রকাশিত হচ্ছে উচ্চমাধ্যমিকের ফলাফল, জানুন রেজাল্ট দেখার নিয়ম
- Madhyamik 2026 Result PPR-PPS | মাধ্যমিক ২০২৬ উত্তরপত্রের রিভিউ বা স্কুটনি পদ্ধতি
- দেখুন মাধ্যমিক রেজাল্ট ২০২৬ | WBBSE Madhyamik Result 2026 Link




